গবাদি পশু কৃষি তথ্য ও সার্ভিস-SUNDARBAN FARM -
গাড়ল পালন

গাড়ল পালন পদ্ধতি

গাড়ল পালন পদ্ধতি ও বাণিজ্যিকভাবে লাভমান হওয়ার উত্তম পন্থা
=========================================
পোল্ট্রির মতো বাণিজ্যিকভাবে ভেড়া পালনের লোভনীয় সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। ভেড়া পালন অন্যান্য প্রাণির চেয়ে লাভজনক। তুলনামূলক কম পুঁজিতে গড়ে তোলা ৩০টি ভেড়ার একটি খামারে বছরে আয় ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ টাকা। বিদেশে ভেড়ার মাংস ও পশমের চাহিদা অনেক বেশি। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিরও প্রচুর সুযোগ রয়েছে। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে খাপ খাইয়ে একটি ভেড়ি বছরে ২ বার এবং প্রতিবারে ২ থেকে ৩টি বাচ্চা দেয়। ছাগলের চেয়ে এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং বাচ্চার মৃত্যুর হারও অত্যন্ত কম। জাতীয় আয় ও সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদের মধ্যে ৪র্থ স্থান অধিকারকারী ভেড়া অত্যন্ত কষ্ট সহিষ্ণু।
প্রতিকুল পরিবেশে শুকনা খড় এবং শস্যের অবশিষ্টাংশ খেয়েও জীবন ধারণ করতে পারে। খামার পরিচালনায় খাদ্য খরচ অনেক কম। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক ভেড়ার ১৫ থেকে ২০ কেজি হতে পারে। প্রতিটি ভেড়া থেকে বছরে গড়ে ১ থেকে ১.৫ কেজি পশম পাওয়া যায়। যা দিয়ে উন্নতমানের শীতবস্ত্র নির্মাণ করা যায়। ভেড়া উৎপাদন বাড়ার হার শতকরা ১২ ভাগ। যা গরু, ছাগল ও মহিষের চেয়ে অনেক বেশি।
এদের বাসস্থানের খরচও কম। নরম, রসালো ও সুস্বাদু ভেড়ার মাংসে আমিষের পরিমাণ গরু ও ছাগলসহ অন্যান্যের চেয়ে বেশি। ভেড়ার মাংসে জিংক, আয়রন এবং ভিটমিনের পরিমাণ বেশি এবং চর্বি ও কোলেষ্টরেল কম। দেশের প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের কথা বিবেচনায় বর্তমান সরকারের ৩১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘সমাজভিত্তিক ও বানিজ্যিক খামারে দেশী ভেড়ার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ (কম্পোনেন্ট-বি) প্রকল্প’।
প্রকল্পের পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ২০১২ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হবে। ইতোমধ্যে দেশে ৩টি ডেমনষ্ট্রেশন খামার স্থাপন, পার্বত্য অঞ্চলের ২৫টি উপজেলায় ৫০০ পরিবারের মাঝে ১৫০০টি ভেড়া বিনামূল্যে বিতরণ, ১৩০০০ সুফলভোগিকে ভেড়া পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া, ১২৮টি কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার ভেড়ার খামার তৈরী, সারাদেশে ১৩০০০ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ভেড়ার খামার স্থাপন এবং ভেড়ার মাংস জনপ্রিয় করার নানামুখি প্রচার চালনোসহ প্রকল্পের প্রায় সব কাজ শেষ হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগে দেশে বর্তমানে ভেড়ার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ। ২০০৭ দেশে ভেড়া ছিল ১৬ লাখ। বর্তমানে বছরে প্রতিটি ভেড়ি গড়ে ২.৫টি করে বাচ্চা দেয়। ভেড়া উন্নয়নে এসময় নেয়া মাত্র ৩ কোটি টাকার একটি পাইলট প্রকল্প ২০১২ সালে শেষ হয়।
গাড়ল নির্বাচন পদ্ধতি:
পালনের জন্য প্রথমে গাড়ল নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ন ধাপ। খামারের লাভ অনেকাংশে নির্ভর করে, উচ্চ উৎপাদনশীল জাতের সুস্থ সবল গাড়ল নির্বাচনের উপর। পালনের জন্য ৭ থেকে ১২ মাস বয়সের সুস্থ গাড়ল নির্বাচন করা উচিত।
গাড়ল পালন ও সুস্থ গাড়ল চেনার উপায়:
১. চোখ, নাক, মুখ উজ্জল ও পরিস্কার হবে।
২.লোম ও চামড়া মসৃন ও পরিস্কার থাকবে।
৩.মুখের উপরে মাজেলে ( কালো জায়গায় ) বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাবে।
৪. ঠিকমত জাবর কাটবে।
৫.চলাফেরা স্বাভাবিক থাকবে।
৬. কান ও লেজ নাড়াচাড়া করবে।
৭. খাবারের প্রতি আগ্রহ থাকবে।
৮. শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক থাকবে।
৯. প্রস্রাব পায়খানা স্বাভাবিক হবে।
১০.কোনো অচেনা লোক কাছে আসলে সতর্ক হয়ে উঠবে।
১১. মশা মাছি তাড়াবে।
১২. দলবদ্ধ ভাবে মাঠে চড়বে ।
খাদ্য ও বাসস্থান:
গাড়লের খাবারের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়……
১. গাড়ল চরে খেতে পছন্দ করে। তবে আবদ্ধ অবস্থায়ও বাহির থেকে (ঘাস/দানাদার) খাদ্য সরবরাহ করে পালন করা যায়।
২. ছাগলের মতোই লতা ও গুল্ম জাতীয় গাছের পাতা এরা খুব পছন্দ করে।
৩. শুকনো ও সংরক্ষিত ঘাস এবং দানাদার খাদ্য এরা খেয়ে থাকে।
৪. এমনকি খাদ্যের অভাব দেখা দিলে গাড়ল খড় ও নাড়া খেয়ে থাকতে পারে।
বিশেষ করে………
৫. পাঠা গাড়ল কে পর্যাপ্ত পরিমান কাচা ঘাস দিতে হবে।
৬. প্রজননের জন্য ব্যবহৃত পাঠাকে দৈনিক ১০ গ্রাম অঙ্কুরিত ছোলা দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
৭. কাচা ঘাসের পরিমান কম হলে বছরে অন্তত ২ বার ভিটামিন এ.ডি.ই. ইনজেকশন ২ থেকে ৩ মি.লি. করে দিতে হবে।
৮. পাঠাকে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্য দেয়া যাবে না।
বাড়ন্ত গাড়লের জন্য একটি আদর্শ খাদ্য তালিকা নিচে দেয়া হলো:
গাড়লের ওজন (কেজি) দানাদার খাদ্য(গ্রাম) ঘাস সরবরাহ(কেজি)
৪ ১০০ ০.৫
৬ ২০০ ০.৮
৮ ২৫০ ১.০
১০ ৩০০ ১.৫- ২.০
১২ ৩৫০ ২.০- ২.৫
১৪ ৪০০ ২.৫-৩.০
১৬ ৪৫০ ৩.০-৩.৫
১৮ ৫০০ ৩.৫-৪.০
বাসস্থান তৈরীতে করনীয়:
এটার উপর লাভক্ষতি, উৎপাদন, গাড়লের পরিচর্যা, রোগাক্রান্ত হওয়ার হার ইত্যাদি নির্ভর করে। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় গাড়লের বাসস্থানের জন্য খোলামেলা ও উচু স্থান নির্বাচন করা উচিত ।
রোদ-বৃষ্টি-ঝড় ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষা করা, বিশ্রাম, খাদ্য প্রদান, সঠিক প্রজনন নিশ্চিতকরণ, মলমূত্রের সুষ্ঠ নিষ্কাসনের ব্যবস্থা, ইত্যাদি বন্দোবস্ত করে গাড়লের জন্য ঘর তৈরী করতে হবে।
ঘরে মাচার উপর গাড়ল থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। মাচা তৈরী সম্ভব না হলে, মেঝেতে শুকনো খড়ের বিছানা দিতে হবে। শীতকালে মাচাতেও খড়ের বিছানা দিতে হবে। বিশেষ করে বাচ্চা কে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে হবে,ভেজা খর শুকিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা যায়।
গাড়ল পালনঃ
চিত্র: দলগতভাবে মাঠে গাড়ল ঘুরে বেড়ায়
বাসস্থানের বৈশিষ্ট আদর্শ:
১.গাড়লের ঘর উচু ও খোলামেলা জায়গায় হতে হবে।
২.পানি নিস্কাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৩.আরামদায়ক হতে হবে।
৪.ঘরের দক্ষিণ ও পূর্ব দিক হতে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৫.বর্জ্য নিস্কাসনের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকবে।
৬.সহজলভ্য ও সস্তা নির্মান সামগ্রী ব্যবহার করতে হবে।
৭.ঘরের মাঝে বেড়া বা পার্টিশন দিয়ে গর্ভবতী গাড়ল বা ছোট বাচ্চা কে আলাদা রাখার ব্যবস্থা থাকবে। যাতে করে প্রসব পূর্ব ও প্রসব পরবর্তী যত্ন ও সেবা দেয়া যায়।
অন্যান্য করনীয় বিষয়:
১. প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে খাবার দিতে হবে।
২. বাসস্থান নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে ও শুস্ক রাখতে হবে।
৩.মলমূত্র এবং ঘর সংলগ্ন ড্রেন বা নালা নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে।
৪. নিয়মিত গোসল করানো ভালো।
৫. তিন মাস অন্তর অন্তর কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে।
৬. নিয়মিত টিকা প্রদান করতে হবে ( পি.পি.আর, এফ. এম. ডি ইত্যাদি )

    SUNDARBANFARM

    %d bloggers like this: