মাছ চাষ কৃষি তথ্য ও সার্ভিস-SUNDARBAN FARM -
ফায়ার মাউথ সিক্লিড

ফায়ার মাউথ সিক্লিড মাছ

মধ্য আমেরিকার মাছ ফায়ারমাউথ সিক্লিড (Firemouth Cichlid, Thorichthys meeki) এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে সর্বপ্রথম আমাদের দেশের নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্যান্য বড় শহরের (যেমন চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, রাজশাহী ইত্যাদি) বাহারি মাছের দোকানে এই মাছের দেখা মেলে।

শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান (Systematic position)
পর্ব: Chordata (chordates)
শ্রেণী: Actinopterygii (Ray-finned fishes)
বর্গ: Perciformes (perch-like fishes)
পরিবার: Cichlidae (cichlids)
গণ: Thorichthys
প্রজাতি: Thorichthys meeki Brind, 1918

সমনাম (Synonyms)
Cichlasoma hyorhynchum Hubbs, 1935
Cichlasoma meeki (Brind, 1918)
Herichthys meeki (Brind, 1918)
Thorichthys helleri meeki Brind, 1918.

সাধারণ নাম (Common name)
বাংলা: ফায়ারমাউথ সিক্লিড, অগ্নিমুখী সিক্লিড, অগ্নিমুখো সিক্লিড
English: Firemouth Cichlid, Fire Mouth, Redbreasted cichlid

বিস্তৃতি (Distribution)
এই মাছের আদিবাস মধ্য আমেরিকার বেলিজ (Belize), মেক্সিকো (Mexico) ও গুয়েতেমালা (Guatemala) (Bailey and Stanford, 1999; Saxena, 2003)। বাহারি মাছ হিসেবে এই মাছ পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তার লাভ করেছে যেমনটা করেছে বাংলাদেশ।
Fishbase (2014) অনুসারে প্রকৃতিতে এদের বিস্তৃতি 22°N – 14°N, 95°W – 87°W ।

সংরক্ষণ অবস্থা (Conservation status)
IUCN 2013 অনুসারে রেড ডাটা বুকে (Red Data Book) এদের অবস্থা Not Evaluated অর্থাৎ এই মাছের সংরক্ষণ অবস্থা এখনো মূল্যায়ন করা হয়নি।

দৈহিক গঠন (Morphology)
দেহ পার্শ্বীয়ভাবে বেশ চাপা। চোখ তুলনামূলক বড় এবং চর্বি নির্মিত প্রশস্ত চোখের পাতা (adipose lid) উপস্থিত। এদের প্রতি পাশে দুটি করে পার্শ্বরেখা দেখতে পাওয়া যায় যার প্রথমটিতে ২১টি এবং দ্বিতীয়টিতে ১৫টি আঁইশ উপস্থিত।
Galib and Mohsin (2011) অনুসারে এদের আদর্শ দৈর্ঘ্য, ফোর্কের (fork) দৈর্ঘ্য, দেহ উচ্চতা, মাথার দৈর্ঘ্য ও পুচ্ছ-দণ্ড (caudal peduncle) মোট দৈর্ঘ্যের যথাক্রমে ৮০, ৯৮.৯৫, ৩২.৬৩, ২৯.৪৭ ও ৯.৪৭ শতাংশ। অন্যদিকে চোখের ব্যস মাথার দৈর্ঘ্যের ২৮.৫৭ শতাংশ।

ফায়ারমাউথ সিক্লিড, Firemouth Cichlid, Thorichthys meeki

পাখনা সূত্র (Fin Formula):
D. 29; P1. 9; P2. 6; A. 10; C. 16. (Galib and Mohsin, 2011)। অর্থাৎ এদের পৃষ্ঠ পাখনায় ঊনত্রিশটি, বক্ষ পাখনায় নয়টি, শ্রোণী পাখনায় ছয়টি, পায়ু পাখনায় দশটি ও পুচ্ছ পাখনায় ষোলটি নরম পাখনা রশ্মি দেখতে পাওয়া যায়।

সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য (Maximum length)
এরা চার ইঞ্চি বা ১০ সেমি পর্যন্ত হতে পারে (Bailey and Stanford, 1999; Saxena, 2003)। বাংলাদেশে এই মাছের রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য তের সেমি (Galib and Mohsin, 2011)। Fishbase (2014) অনুসারে এদের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১৭ সেমি তবে ৬.১ সেমি দৈর্ঘ্যের মাছই বেশি দেখা যায়।

আবাস্থল (Habitat)
উষ্ণ জলের স্বাদুপানির মাছ যেখানে পানির প্রবাহ ধীর বা স্থির এমন পরিবেশ এদের পছন্দ। কাদা, বালু বা পাথর উপস্থিত রয়েছে এমন তলদেশ বিশিষ্ট জলাশয়ে এরা বাস করে। অগভীর জলাশয়ে তীরবর্তী স্থান যেখানে জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতি রয়েছে এমন স্থানে এরা নিরাপদ মনে

খাদ্য এবং খাদ্যাভ্যাস (Food and feeding habit)
প্রকৃতিতে এরা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় প্রকারের খাবারই খেয়ে থাকে। এরা যেমন শেওলা খেয়ে থাকে তেমনই প্রাণীও শিকারে থাকে। এ্যাকুয়ারিয়ামে এরা অন্যান্য ছোট মাছ খেয়ে থাকে।
বাহারি মাছের দোকানে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের প্যাকেটজাত বাণিজ্যিক মাছের খাবার যেমন- ফ্লেকস (flakes), পিলেট (pellets) ইত্যাদি এরা খেয়ে থাকে।

জীবনকাল ও প্রজনন (Lifecycle and Breeding)
এদের জীবনকাল আট বছর বা তারও বেশি (Fishlore, 2014)।
একই বয়সের পুরুষেরা স্ত্রীদের চেয়ে বড় হয়ে থাকে। প্রজনন ঋতুতে পুরুষেরা অনেক বেশি উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করে এবং এদের পৃষ্ঠ পাখনার শেষ প্রান্ত তীক্ষ্ণ হয়ে থাকে। প্রজনন ঋতুতে পুরুষদের অগ্র-অঙ্কীয় পাশ আগুণের মত লাল বর্ণ ধারণ করে। এখান থেকেই মাছের নাম হয়েছে Firemouth Cichlid। এই উজ্জ্বল বর্ণ অন্যান্য মাছকে ভীতি প্রদানের মাধ্যমে এই মাছের প্রজনন এলাকায় (breeding territory) প্রবেশে নিরুৎসাহিত করে।
Lee et al (1980) অনুসারে এরা নিমজ্জিত পাথর,কাঠের টুকরা বা অগভীর স্থানে খননকৃত গর্তে ডিম পাড়ে। স্ত্রীরা এক দফায় এরা ১০০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত ডিম দেয়। পুরুষেরা ডিম নিষিক্ত করার পর মা-বাবা উভয়ে মিলে ডিম পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবার পর নবজাতকদের অগভীর গর্তে স্থানান্তর করে এবং পাহারা দেয়।
এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের প্রজনন করানো বেশ কঠিন কারণ এরা বেশ আক্রমণাত্মক এবং এদের জন্য তুলনামূলক বড় আকারের এ্যাকুয়ারিয়ামের প্রয়োজন হয়। তবে এ্যাকুয়ারিয়ামে এই মাছের প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে প্রজনন করানো অসম্ভব নয়।
প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামে ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে পাথরের টুকরা, কাঠ ইত্যাদি ব্যবহার করে আড়ালের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এছাড়াও ফুলদানী, মাটির পাত্র বা পিভিসি পাইপ (pvc pipe) ইত্যাদি ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
প্রজনন এ্যাকুয়ারিয়ামের তাপমাত্রা কমপক্ষে ৮২° ফা. বা ২৮° সে. হওয়া আবশ্যক। উন্নতমানের পর্যাপ্ত খাবারের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিণত ও প্রজনন উপযোগী একজোড়া মাছ একটি এ্যাকুয়ারিয়ামে প্রজননের জন্য দেয়া যায় তবে যদি খুব বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ পরিলক্ষিত হয় তবে ডিম পাড়ার পূর্ব পর্যন্ত কাঁচের বিভাজক (divider) ব্যবহার করে এদেরকে আলাদা রাখার দরকার হয়। স্ত্রীরা ডিম পাড়ার পরপরই পুরুষেরা ডিমগুলিকে নিষিক্ত করে এবং মা-বাবা উভয়েই ডিমগুলো পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া শুরু করার আগেই মা-বাবা মাছ আলাদা এ্যাকুয়ারিয়ামে স্থানান্তর করতে হবে। সদ্যজাত বাচ্চাদের ব্রাইন শ্রিম্প (brine shrimp) বা টিউবিফেক্স (tubifex) এর বাচ্চা অথবা মিহি করা বাণিজ্যিক খাবার সরবরাহ করা আবশ্যক।

উপযোগী পরিবেশ (Suitable Environment)
স্বাদুপানির এই মাছ তলদেশের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। প্রকৃতিতে এই মাছের অনুকূল পরিবেশ হচ্ছে- পিএইচ (pH): ৬.৫-৭.৫ এবং তাপমাত্রা ২৬-৩০ ডিগ্রী সে (Fishbase, 2014)।
Fishlore (2014) অনুসারে এ্যাকুয়ারিয়ামে এদের অনুকূল তাপমাত্রা ৭৫-৮০° ফা. বা ২৪-২৭° সে. এবং পিএইচ ৬.৫-৭.৫।
এই মাছ আক্রমণাত্মক আচরণের জন্য বিখ্যাত। এরা এ্যাকুয়ারিয়ামের অন্যান্য মাছ কে আক্রমণ করে আঁইশ ও পাখনার ক্ষতি করে থাকে। বিশেষত গোল্ডফিশের বিভিন্ন ভ্যারাইটিকে এরা সহজেই আক্রমণ করে থাকে। এমনকি দেশীয় মাছও এদের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে।

রোগ (Diseases)
বাংলাদেশে এই মাছের রোগের উপস্থিতি বিষয়ক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance)
এ্যাকুয়ারিয়ামের বাহারি মাছ হিসেবে পৃথিবীব্যাপী এর চাহিদা রয়েছে। শক্ত প্রকৃতির এই মাছের ব্যবস্থাপনা সহজ হওয়ায় যারা এ্যাকুয়ারিয়ামে বাহারি মাছ পালন শুরু করতে আগ্রহী তারা এই মাছ নির্বাচন করতে পারেন নিশ্চিতভাবেই।
এছাড়াও এই মাছকে ছোট আকারের পুকুর, ডোবা, এ্যাকুয়ারিয়াম ইত্যাদি জলাশয়ে প্রজনন করানোর মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব।
মৎস্য আচরণ গবেষণাগারে (fish behaviour lab) বিভিন্ন পরীক্ষায় পরীক্ষার মাছ (experimental fish) হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে।

    SUNDARBANFARM

    %d bloggers like this: