হাঁস মুরগির পালন কৃষি তথ্য ও সার্ভিস-SUNDARBAN FARM -
মুরগির ঠোকরা ঠুকরি রোগ

মুরগির ঠোকরা ঠুকরির রোগ

মাংস ও বাচ্চার ব্যাপক চাহিদা থাকায় বর্তমানে তরুণ খামারিদের মাঝে দেশী মুরগি পালনের প্রতি বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অনেকগুলো দেশী মুরগি বানিজ্যিক ভাবে একাত্রে পালন করতে গিয়ে খামারী যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলোর মধ্যে দেশী মুরগির ঠোকরা ঠুকরি, লেজ ও শরীরের পালক খেয়ে পেলা অন্যতম। এর ফলে একদিকে যেমন মুরগি মারা যায় অন্যদিকে লেজ ও পালক বিহীন মুরগি বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে নানা সমস্যার সমূক্ষিণ হতে হয়। তাই মুরগির এসব বদঅভ্যাসকে চিহ্নিত করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুব জরুরি। এটা যে কোনো বয়সের মুরগির হতে পারে। তবে দেশি মুরগির বয়স যখন ১ মাসের কাছাকাছি হয় তখন থেকে ৩ মাস প্রর্যন্ত এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। এটা মূলত দেশি মুরগির বদঅভ্যাস। এ অভ্যাসের কারণে মুরগি অন্য মুরগির পালক বিশেষ করে লেজের পালক খেয়ে পেলে এবং লেজ ও পায়ুপথের নরম মাংশে আঘাত করে রক্ত গ্রহণ করে। ফলে মুরগির অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। অনেক সময় মুরগির মৃত্যও ঘটে। মুরগি যদি একবার রক্তের স্বাদ পায় তাহলে সে অন্য মুরগিকে ঠোকরাতে থাকে এবং এ অভ্যাসটা পুরো ফ্লকে ছড়িয়ে পড়ে।

নিম্নোক্ত এক বা একাধিক কারণে দেশী মুরগি ঠোকরা ঠুকরি করে থাকে।
১.মুরগির ঘনত্ব বেশি হওয়াঃ মুরগিকে তার প্রয়োজন মতো জায়গা দিতে হয়। যদি তার জায়গার ঘাটতি হয় সেক্ষেত্রে ঠোকরা ঠুকরি শুরু হয়ে যেতে পারে।
২.অতিরিক্ত তাপঃ প্রয়োজন অতিরিক্ত তাপের ফলে মুরগির বিপাকক্রিয়া ঠিক থাকে না । যার ফলে মুরগির খাদ্যের প্রতি অনীহা দেখা যায় এবং একে অপরের সঙ্গে হিংসাত্মক ভাব প্রদর্শন করে এবং এক মুরগি অন্য মুরগির সাথে ঠোকর ঠুকরি শুরু করে।
৩.খাবার ও পানির পাত্র কম দেয়াঃ মুরগির জন্য সর্বদা পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে হবে যাতে প্রয়োজন মতো পানি পান করতে পারে। খাবার ও পানির পাত্রের অভাব হলে মুরগির মধ্যে হিংসাত্মক ভাব প্রকাশ পায়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পানি ও খাদ্য গ্রহণ করে এবং মুরগির মধ্যে ঠোকরা ঠুকরির প্রভাব বেড়ে যায়।
৪.কেবল দানাদার খাদ্য সরবরাহঃ মুরগির খাদ্যে পিলেট ও ম্যাস উভয়ের মিশ্রণ থাকা খুব জরুরি। অন্যথা মুরগি দানাদার খাদ্য খেতে খেতে ঠোকরানো প্রভাব বেশি হতে থাকে। তাই পরিমিত দানাদার খাবারের পাশাপাশি গুঁড়া খাবারও খাওয়াতে হবে।
৫.সঠিক চিকিৎসার অভাব হলেঃ মুরগি কোনোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে সাথে সাথে আলাদা করে চিকিৎসার করতে হবে। সময়মত চিকিৎসা না করলে অন্য মুরগি আক্রান্ত মুরগিকে ঠোকরানো শুরু করে। ফলে রক্তের স্বাদ পায় এবং ঠোকরানোর প্রবণতা বেড়ে যায়।
৬.পরজীবী ও উকুনের আক্রমণঃ বানিজ্যিক দেশি মুরগির খামারে পরজীবীর আক্রমণ বেশি হয়। পরজীবীর আক্রমণ হলে মুরগি খুব অশস্তি বোধ করে এবং নিজের ঠোঁট দিয়ে তা চুলকাতে চেষ্টা করে। তাতে অনেক মুরগির পালক উঠে যায়, অনেক সময় মুরগির রক্তক্ষরণও হতে পারে। ক্ষরিত রক্ত কোনো মুরগি গ্রহণ করে তাহলে সেই মুরগির মধ্যে রক্ত খাওয়ার প্রভাব বেড়ে যায় এবং সুস্থ মুরগিকে আক্রমণ করে রক্ত শোষণ করতে শুরু করে।
৭.সময় মতো খাবার না দেয়াঃ মুরগিকে তার প্রয়োজনীয় খাবার সময় মতো দিতে হয়। দীর্ঘক্ষণ খাবার ছাড়া থাকলে মুরগি খাবারের তাগিদে নিজেদের মধ্যে মারামারি ও ঠোকরা ঠুকরি করে।
৮. মুরগির ঘরে প্রয়োজন মতো আলো রাখতে হবে । এর চেয়ে মাত্রা বেশি হলে মুরগির রেস্ট নিতে সমস্যা হয় ফলে ঠোকরা ঠুকরি শুরু করে।
৯. অতি উচ্চশক্তি ও কম ফাইবার যুক্ত খাবারের ফলেও ঠুকরা ঠুকরির স্বভাব বৃদ্ধি পায়।
১০.খনিজ লবণের অভাবেও মুরগির ঠোকরা ঠুকরি বৃদ্ধি পায়।

প্রতিকারঃ
দেশি মুরগির ঠুকরা ঠুকরি হতে রোধ করতে নিম্নোক্ত বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর নিতে হবেঃ
১.মুরগিকে তার প্রয়োজনমতো সব পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি ঠিক রেখে খাদ্য দিতে হবে। সুষম খাদ্যের কোনো ঘাটতি যেন না থাকে তা লক্ষ রাখতে হবে। ভিটামিন ও মিনারেলের ওপর সুনজর রাখতে হবে।
২. মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী প্রর্যপ্ত সংখ্যাক পাত্রে পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ খাবার-পানি সরবরাহ করতে হবে। খাবারের জায়গা সবসময় পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মুরগির বয়স অনুযায়ী খাবার নির্ধারণ করতে হবে।
৪.মুরগিকে তার পর্যাপ্ত জায়গা দিতে হবে।
৫.বেশি মুরগি একসঙ্গে গাদাগাদি করে যেন না থাকে সে দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।
৬.পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭.শেডের আলো সব জায়গায় যেন সমভাবে থাকে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।
৮.মিথিওনিন মুরগির ঠুকরা ঠুকরি প্রতিরোধ করতে বেশ সহায়তা করে তাই খাবারে পরিমিত মিথিওনিন যোগ করতে হবে।

চিকিৎসাঃ
ঠোকরা ঠুকরির কারণ চিহ্নিত করতে না পারলে সঠিকভাবে চিকিৎসা করা মুশকিল।
১.খনিজ লবণের অভাবের ফলে প্রতি লিটার পানিতে ৫ গ্রাম খাওয়ার লবণ দেয়া যেতে পারে এবং মুরগির খাদ্য নিজে তৈরি করলে ১০০ কেজি খাবারের সাথে ২ কেজি লবণ মিক্স করতে হবে।
২.মুরগির রক্ত শূন্যতার জন্য ফেরোভেট দিতে পারেন।
৩.প্রোটিন ও মিনারেল এর অভাব দূর করতে প্রোটোমিন দেয়া যায়।
৪.জিং ও ক্যালসিয়ামের অভাব পূরনের জন্য জিংক সালফেট ও ক্যালপেক্স দেয়া যেতে পারে।
উল্লেখ্য এসব মেডিসিন ব্যবহারে সাময়িক ভাবে মুরগির ঠোকরা ঠুকরি বন্ধ করা যায়। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

    SUNDARBANFARM

    %d bloggers like this: