দানা জাতীয় ফসল চাষ কৃষি তথ্য ও সার্ভিস-SUNDARBAN FARM -
লটকন চাষ পদ্ধতি

লটকন চাষ পদ্ধতি

লটকন চাষ পদ্ধতিঃ

লটকন বাংলাদেশের সুপরিচিত একটি অপ্রচলিত ফল। উৎপাদনের পরিমাণ বেশি না হলেও বাংলাদেশের সব এলাকাতেই এর চাষ হয়। তবে নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, গাজীপুর, নেত্রকোনা ও সিলেট এলাকায় এর চাষ বেশী লক্ষ্য করা যায়। টক-মিষ্টি স্বাদযুক্ত লটকন খাদ্যমানের দিন দিয়ে সমৃদ্ধ। ফল খেলে বমি বমি ভাব দূর হয় ও তৃষ্ণা নিবারণ হয়। শুকনো পাতার গুড়া খেলে ডায়রিয়া ও মানসিক চাপ কমায়।

লটকনের জাতঃ

বারি লটকন-১
‘বারি লটকন-১’ জাতটি বাংলাদেশে চাষের জন্য ২০০৮ সালে অনুমোদন করা হয়। এটি একটি মাঝ মৌসুমী জাত। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে এর ফল পরিপক্কতা লাভ করে। গাছ প্রতি ফলের সংখ্যা ৩৩৩৪টি।

এটি একটি নিয়মিত ফলদানকারী উচ্চ ফলনশীল জাত। গাছপ্রতি ফলন ৪৫ কেজি (১২.৫০ টন/হেক্টর)। মাঝারি আকারের প্রতিটি ফলের গড় ওজন ১৪ গ্রাম। প্রতিটি ফলে ৪-৫টি ক্ষুদ্রাকারের বীজ থাকে এবং ফল গোলাকার, ফলের শাঁস রসালো, নরম এবং টক-মিষ্টি স্বাদ (ব্রিক্সমান ১৫.৬০)। প্রতিটি ফলে কোষের সংখ্যা ৪-৫টি।

লটকনের এ জাতটি বাংলাদেশের সর্বত্র চাষ উপযোগী

উৎপাদন প্রযুক্তিঃ

মাটিঃ

সুনিষ্কাশিত প্রায় সব ধরণের মাটিতেই লটকনের চাষ করা যায়, তবে বেলে দোঁ-আশ মাটি লটকন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। লটকন গাছ স্যাঁতস্যাঁতে ও আংশিক ছায়াময় পরিবেশে ভাল জন্মে কিন্তু জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারেনা।

চারা তৈরিঃ

বীজ থেকে চারা উৎঃপাদন করে বংশ বিস্তার করা যায়। তবে এতে ফলের মাতৃগুণ বজায় থাকে না। এজন্য গুটিকলমের চারা ব্যবহার করা ভালো। লটকনের বীজের আবরণ অত্যন্ত শক্ত। তাই বীজ জমিতে বা পলিব্যাগে বোনার আগে এক থেকে দুদিন পানিতে ভিজিয়ে নিলে চারা দ্রুত গজায়। প্রাথমিক অবস্থায় গাছের বৃদ্ধি তাড়াতাড়ি হয়। এরপর এক বছর বয়সের চারা মূল জমিতে লাগানো যায়। গুটিকলমের জন্য নির্বাচিত গাছের সুস্থ, সবল, সতেজ ও নিরোগ ডালের মধ্যে গ্রীষ্মের প্রথম ভাগে গুটিকলম করতে হয়। চিকন ও সমান্তরাল ডাল এ কাজের জন্য ব্যবহার করা উত্তম। এতে বর্ষার আগে শিকড় বের হবে। ডাল কেটে গুটিকলম মূল জমিতে বর্ষাকালে লাগানো যাবে। বীজের গাছে ফল আসতে পাঁচ-ছয় বছর সময় লাগে কিন্তু কলমের গাছে দু-তিন বছর পর ফল ধরা শুরু করে।

জমি তৈরিঃ

চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল এবং আগাছামুক্ত করে নিতে হবে।

গর্ততৈরি ও সার প্রয়োগঃ

১ মিটার চওড়া ও ১ মিটার গভীর গর্ত করে প্রতি গর্তে ১৫-২০ কেজি জৈব সার/গোবর, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ২৫০ গ্রাম এমপি সার গর্তের মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে রাখতে হবে।

চারা রোপনঃ

গর্ত ভরাট করার ১০-১৫দিন পর নির্বাচিত চারা গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে লাগাতে হবে। চারা লাগানোর পরপরই পানি দিতে হবে।

রোপণের সময়ঃ

বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য (এপ্রিল-মে) মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে বর্ষার শেষের দিকে অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন (সেপ্টেম্বর) মাসেও গাছ রোপণ করা যেতে পারে।

সার প্রয়োগঃ

পূর্ণ বয়স্ক গাছ প্রতি বছর ১৫-২০ কেজি গোবর, ১ কেজি ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০০ গ্রাম এমপি সার সমান দুইভাগে ভাগ করে বর্ষার আগে ও পরে ২ বারে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

পরিচর্যাঃ

সেচ
চারা রোপনের প্রথম দিকে ঘন ঘন সেচ দেয়া দরকার। ফল ধরার পর শুকনো মৌসুমে শীতের শেষে গাছে ফুল আসার পর দু’একটা সেচ দিতে পারলে ফলের আকার বড় হয় ও ফলন বাড়ে।

ডাল ছাঁটাইঃ

গাছের মরা ডাল এবং রোগ ও পোকা আক্রান্ত ডাল ছাঁটাই করে দিতে হবে

পোকামাকড় ও প্রতিকারঃ

ফল ছিদ্রকারী পোকা
ফল ছোট অবস্থায় যখন ফলের খোসা নরম থাকে তখন এই পোকা ফলের খোসা ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। পরবর্তী কালে ডিম থেকে লাভা উৎপন্ন হয় এবং ফল পাকলে ফলের নরম শ্বাস খেয়ে থাকে।

প্রতিকারঃ
আক্রান্ত ফল পোকাসহ নষ্ট করে ফেলতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে পারফেকথিয়ন বা লেবাসিড ৫০ ইসি মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ২-৩ বার ফল ছোট অবস্থায় গাছে স্প্রে করতে হবে।

মিলিবাগ ও সাদা মাছি পোকাঃ
সাধারণত শীতকালে এদের আক্রমনে পাতায় সাদা সাদা তুলার মত দাগ দেখা যায়। এরা গাছের পাতার রস শুষে গাছকে দূর্বল করে। রস শোষণের সময় পাতায় বিষ্ঠা ত্যাগ করে এবং সেই বিষ্ঠার উপরই শুটিমোল্ড নামক ছত্রাক জন্মে।

প্রতিকারঃ
আক্রান্ত পাতা ও ডগা ছাঁটাই করে ধ্বংস করতে হবে। রগর/রক্সিয়ন ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে আক্রান্ত পাতা ও গাছের ডালপালা প্রতি ১০ দিন অন্তর ২-৩ বার স্প্রে করে ভিজিয়ে দিতে হবে।

চেপার বিটলঃ
এই পোকা পাতার নিচে ডিম পাড়ে এবং ডিম থেকে লার্ভা উৎপন্ন হওয়ার পর লার্ভা পাতা খেয়ে ছিদ্র করে ফেলে এবং আস্তে আস্তে সমস্ত পাতা খেয়ে জালের মত করে ফেলে।

প্রতিকারঃ
সুমিথিয়ন/ডেবিকুইন ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়।

স্কেল পোকাঃ
এ পোকা প্রথমে পাতার নিচে ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বাচ্চা বের হলে এরা পাতার রস শোষণ করে খেতে থাকে। আস্তে আস্তে এরা কচি ডালেও আক্রমন করে সমস্ত গাছকে মেরে ফেলে।

প্রতিকারঃ
এই পোকার আক্রমন দেখা যাওয়া মাত্র ব্রাশ দিয়ে ঘষে মেরে ফেলতে হবে অথবা সাবানের পানি দিয়ে স্প্রে করলেও প্রাথমিকভাবে দমন করা যায়। আক্রমন বেশী দেখা দিলে ট্রেসার/(০.২ এম.এল/লিটার)/ফিপ্রোনিল (১ এমএল/লিটার) অথবা একতারা (০.৫ গ্রাম/লিটার) হারে স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

রোগবালাই ও প্রতিকারঃ

এ্যানথ্রাকনোজঃ
কলেটোট্রিকাম সিডি নামক ছত্রাক লটকনের এ্যানথ্রাকনোজ রোগের কারণ। গাছের পাতা, কান্ড, শাখা-প্রশাখা ও ফল এ রোগ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ফলের গায়ে ছোট ছোট কালো দাগই এ রোগের প্রধান লক্ষণ। তাছাড়া ফল শক্ত, ছোট ও বিকৃত আকারে হতে পারে। ফল পাকা শুরু হলে দাগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে থাকে এবং ফলটি ফেটে বা পচে যেতে পারে।

প্রতিকারঃ
গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। গাছে ফল ধরার পর টপসিন-এম অথবা নোইন প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি. হারে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর অন্তর ২-৩ বার ভালভাবে স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায়।

হটাৎ করে গাছ মারা যাওয়া (উইল্ট)ঃ
ফিউজেরিয়াম উইল্ট নামক রোগের আক্রমনে সমস্যা হয়। প্রথমে পাতা হলুদ হয়ে আসে এবং পরে শুকিয়ে যায়। এভাবে পাতার পর প্রশাখা-শাখা এবং ধীরে ধীরে সমস্ত গাছই ৮-১০ দিনের মধ্যে নেতিয়ে পড়ে এবং মারা যায়।

প্রতিকারঃ
এ রোগের কোন দমন ব্যবস্থা নেই। তবে নিন্ম লিখিত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
মাঠে/বাগানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় বর্দ্দোমিক্সার অথবা কিউপ্রাভিট/কপার অক্সিক্লোরাইড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে। বাগানের মাটির অম্লতা কমানোর জন্য জমিতে ডলোচুন প্রয়োগ করতে হবে ( ২৫০-৫০০ গ্রাম/গাছ)।

ফল ঝরে যাওয়াঃ
অধিক খরা বা শীত মৌসুমে এবং ফুল ধরার সময় মাটিতে সেচ না দেয়া, মাটিতে বোরনের অভাব, রোগ বা পোকার আক্রমন ইত্যাদি অনেক কারণে ফল ঝরে যেতে পারে।

প্রতিকারঃ
শীত বা খরা মৌসুমে নিয়মিত সেচ প্রদান করতে হবে। গাছে ফুল ফোটার পর বৃষ্টি না হলে অবশ্যই সেচ প্রদান করতে হবে। নিয়মিত সার ব্যবহার করতে হবে।

ফল সংগ্রহঃ

শীতের শেষে গাছে ফুল আসে এবং জুলাই-আগস্ট মাসে ফল পাকে। ফলের রং হালকা হলুদ থেকে ধূসর বর্ণ ধারণ করলে ফল সংগ্রহের উপযুক্ত সময়।

ফলনঃ

কলমের গাছে সাধারণত ৪ বৎসর বয়স থেকে ফল আসা শুরু হয় এবং ১৮-২০ বৎসরের গাছে সর্বোচ্চ ফলন থাকে। অবস্থাভেদে গাছের বয়সের উপর ভিত্তি করে গাছ প্রতি ৪ কেজি (৪ বৎসর) থেকে ১২০/১৩০ কেজি (১৮-২০ বৎসর) পর্যন্ত ফলন হয়ে থাকে।

    SUNDARBANFARM

    %d bloggers like this: